বই রিভিউঃ ১১.২২.৬৩ – স্টিফেন কিং

469

স্টিফেন কিং এর বই মানেই হচ্ছে থ্রিল, রহস্য এবং ভয় মেশানো অদ্ভুত এক অনুভুতি। ১১.২২.৬৩ বইটির ক্ষেত্রেও তার ব্যাতিক্রম হয়নি। থ্রিলার মাস্টার এর পক্ষ থেকে আমরা চেষ্টা ভাল ভাল সব থ্রিলিং বই এর সাথে আপনাদের পরিচয় করিয়ে দিতে। তারই ধারাবাহিকতায় আজ আমরা হাজির হয়েছি স্টিফেন কিং এর এই বইটির উপরে রিভিউ নিয়ে। সবাই তৈরি তো?

ধরুন, এক ছুটির দিনে খুব বেলা করে আপনি ঘুম থেকে উঠলেন। আলসেমি কাটাতে আড়মোড়া ভাঙলেন। দাত মেজে মুখ ধুয়ে ভাবলেন- “যাই, কেরামত ভাইয়ের স্টল থেকে এক কাপ চা খেয়ে আসি”। কেরামত আপনার পাড়ার চায়ের দোকানদার। তার দোকানে চা খেতে গিয়ে কি মএন করে যেন একটা পান খেলেন। তারপর পানের পিক ফেলার জন্য কেরামত ভাইয়ের দোকানের পেছন দিকে গেলেন। সেখানে গিয়ে বেড়ার কাছে পানের পিক ফেলতে গিয়ে অসাবধানে আপনার পা গিয়ে পড়লো ছোট একটা গর্তে। গর্ত তো না, এ যেন পাতালে নামার সিঁড়ি। আপনি অবাক হয়ে ভাবলেন, ঘটনা কি? মাটির নিচে সিড়ি কেন? সিঁড়ি দিয়ে কই যাওয়া যায় দেখি তো। নামতে থাকলেন আপনি।

নামতে নামতে খানিকটা পরে যেখান দিয়ে আপনার পা বেরিয়ে এলো সেটা মফিজের স্টলের পেছনের কোন জায়গা না! জায়গাটা আপনার পরিচিত লাগছে কিন্তু বুঝতে পারছেন না কোথায় এটা! পেছনে তাকিয়ে আপনার চোখ চানাবড়া হয়ে গেলো। আপনার পরিচিত কেরামত ভাইয়ের চায়ের দোকান এবং তার সংলগ্ন কোন ঘরবাড়িই আর নেই। আপনি হতভম্ব হয়ে আবিষ্কার করলেন আপনি প্রায় ৫০ বছর আগের পৃথিবীতে চলে গেছেন। কনগ্র্যাচুলেশান্স! আপনি এই মাত্র টাইম ট্রাভেল করে ফেললেন।

স্টিফেন কিংয়ের বিখ্যাত উপন্যাস ১১.২২.৬৩ এর কাহিনী শুরু হয়েছে অনেকটা এই ভাবে সময় পরিভ্রমন নিয়ে। তবে বই টি সায়েন্স ফিকশান নয় মোটেই, এর সাথে আছে প্রেম, সংঘাত, মানব মনের দ্বন্দ্ব, গভির জীবনবোধ সহ আরও অনেক কিছুই।

সংক্ষিপ্ত কাহিনীঃ ১১.২২.৬৩

গল্পের নায়ক জ্যাক এপিং স্কুলে পড়ায়, পাড়ার বার্গার দোকানে সস্তা বার্গার খেতে গিয়ে রেস্টুরেন্ট মালিক অ্যাল-এর সাথে হালকা পরিচয় হয়। জ্যাক একা , শিক্ষিত, স্বাধীন এবং হ্যান্ডসাম। জ্যাক বিয়ে করেছিল কিন্তু তার বউ তাকে ছেড়ে অন্য লোকের সাথে চলে গেছে। কারণটা মজার: জ্যাকের সহজে কান্না পায়না মানে কিনা বউয়ের ভাষায় তার মধ্যে আবেগ-অনুভূতির বালাই নেই।

একদিন সেই রেস্টুরেন্ট মালিক অ্যাল তাকে ফোন করে অনুরোধ করে দেখা করার জন্য। জ্যাক দেখা করে। অ্যাল তাকে জানায় তার দোকানের পিছনে একটা হোল আছে যা দিয়ে সে অতীতের পৃথিবীতে চলে যেতে পারে। তবে যে কোন সময়ে না, ১৯৫৮ সালের সেপ্টেম্বর ৯ তারিখ, সকাল ১১.৫৮তে, স্থান: লিসবন ফলসে। সেখানে গিয়ে যতবছর ইচ্ছে কাটিয়ে আসা যাবে, যে কোন ঘটনায় অংশগ্রহণ করা যাবে, অতীতের কোন ঘটনাকে পরিবর্তন করে আসা যাবে, তবে যখনি ফিরে আসবে ততক্ষনে বর্তমান পৃথীবীতে মাত্র দুই মিনিট সময় অতিবাহিত হবে। তবে যতবার যাওয়া যাবে, প্রতিবার হবে নতুন একটা জার্নি। মানে সে যদি একটা কিছু পরিবর্তন করে আসে, পরবর্তীতে তার জার্নির সাথে সাথে আবার সেই নির্দিষ্ট টাইম লাইন শুরু হবে, ফলে কোন ঘটনার কোন দাগ থাকবেনা, কেউ তাকে মনে রাখতে পারবেনা। ব্যাপারটা পরিক্ষিত, অ্যাল বহুবছর তাই করে আসছে, মূলত তার দোকানের কম দামী বার্গারের কারণ হলো সে সেসব উপাদান কিনে আনে ১৯৫৮ সালের দোকান হতে ১৯৫৮ সালের দামে, ফলে ২০১১ সালের পৃথিবীতে তা অতি কম দামে বিক্রি করা যায়।

কিন্তু এতদিন পর কেন অ্যাল জ্যাককে এটা জানালো? কারণ, অ্যালের দৃঢ় ধারণা, যদি অতীতের একটা বিশাল কোন খারাপ ঘটনাকে সে পরিবর্তন করে দিয়ে আসতে পারে, তবে বর্তমানের পৃথিবী নিশ্চয় আরো সুন্দর হবে। যেমন, যে সময়ে সে ফিরে যায়, তার মাত্র ৫ বছর পর ডালাসে প্রেসিডেন্ট জন এফ কেনেডি হত্যা কান্ড ঘটে। ঘটনার নায়ক লি হার্ভে অসওয়াল্ড। যদি সেই নভেম্বরের ২২ তারিখের আগেই তাকে মেরে ফেলা যায়, তাহলে কেনেডি মরবেনা, তার কনসিকোয়েন্সে ভিয়েতনাম ওয়ার হবেনা, রেস রায়ট হবেনা, বর্তমানের পৃথিবী হতে পারে এক সুন্দর পৃথিবী। কিন্তু সে নিজে তা করছেনা, কারণ সে চেষ্টাও সে করেছিল, কিন্তু তার ক্যান্সার ধরা পড়ে, হাতে মাত্র কয়টা দিন তার, ১৯৫৮ তে গিয়ে ৫ বছর অপেক্ষার করতে সে পারবেনা, তার আগেই সে মারা যাবে। ব্যাপারটা জ্যাককে দারুন একটা অভিজ্ঞতার মুখোমুখি করে দেয়। নিজেই পরিক্ষা করে জ্যাক, কয়েক মুহূর্তের জন্য সে অতীতের পৃথীবীতে যায়, দারুন স্বাদের রুট বিয়ার খেয়ে প্রত্যক্ষ করে আসে ব্যাপারটা। মৃতপথযাত্রী একজনের বিশেষ অনুরোধ, সাথে তার নিজস্ব কৌতূহল আর ব্যক্তিগত একটা কারণ, সবমিলিয়ে জ্যাক প্রস্তুত হয়, শুরু হয় স্টিফেন কিং পাঠকের প্রায় ৭০০ পৃষ্টা ব্যাপী এক এপিক জার্নির।

স্টিফেন কিং এর বই রিভিউঃ ১১.২২.৬৩

সাধারণত টাইম ট্রাভেলিংয় গল্পের বইগুলোতে যা হয়, প্রথম কিছু চ্যাপ্টার জুড়ে নানাবিধ তত্ত্ব, যন্ত্র এটা সেটা দিয়ে পাঠককে তৈরী করে নেওয়া হয় এ অবিশ্বাস্য কান্ডের সাথে একাত্ন করে নেবার জন্য। কিং কিছুই করেননা, ২৪-২৫ পৃষ্ঠার মাথায়ই পাঠককে জ্যাকের সাথে পাঠিয়ে দেন টাইম ট্রাভেলিংয়ে। তত্ত্ব নিয়ে তিনি সময় নষ্ট করেন দু’লাইন। তারপর সংঘাত, প্রেম, রোমান্স, ধাওয়া , পাল্টা ধাওয়া , ফাইট , জুয়া খেলা এবং সারাক্ষন তারপর কি ? তারপর কি? ‘র মধ্যে রেখে জ্যাকের জার্নি সামনে এগিয়ে যায় অতীতে যেখানে সে নিজেকে পরিচয় জর্জ এম্বারসন নামে। সাথে সাথে পাঠকের। কি হতে পারে অতীত পাল্টে দিয়ে আসলে?

তাছাড়া চাইলেই পাল্টে দেয়া যায়না অতীতঘটনা প্রবাহ, কেননা সেটা একটা হারমোনি, পাল্টাতে চাইলে সে পাল্টা বাধা দেবার চেষ্টা করে, কিংয়ের ভাষায়… ইট ফাইটস ব্যাক।কেন? জবাব আছে এডওয়ার্ড লরেন্জের Butter fly Effect। এক কথায় ব্যাপারটা এমন যে- কোন এক স্থানের ঘটে যাওয়া একটা ছোট্ট পরিবর্তন অন্য স্থানের একটা বড় ঘটনার নিয়ামক হিসেবে কাজ করতে পারে। কিংবা যদি বলি, চীন দেশে একটা প্রজাপতি পাখা নাড়ালো, আমেরিকাতে তুফান হওয়ার কারণ হিসেবে তার প্রভাব কতটুকু পড়তে পারে? তো, জ্যাকের পাল্টে দেয়া একটা বড় ঘটনার কি ইফেক্ট হতে পারে, বইটি পড়ার জন্য এই একটা কৌতুহলই যথেষ্ট হয়তো, কিন্তু স্টিফেন কিংয়ের লেখা মানে ঘটনা জানা না শুধু। তার মোহনীয় গল্প বলার ভঙ্গিই ৮০০ পৃষ্টা ধরে রাখে পাঠককে। গোস্ট স্টোরী আর প্যারানরমাল কাহিনী লেখার জন্য স্টিফেন কিং একজন কিং। এই প্রথম তিনি অন্য ধরনের গল্প শোনাতে নামলেন তার ৫৮তম বইয়ে, ক্রিটিকদের মতে , এটা হয়তো তার ক্লাসিক বই নয়, তবে অন্যতম নিঃসন্দেহে।

শেষে কি হয়? শেষের টুইস্ট গুলোর জন্যই যেন পুরো বই পড়া। ব্রাভো কিং।

বই নিয়ে শেষ কিছু কথা

বইটি প্রকাশ হওয়ার পর স্টিফেন কিং বলেছেন যে এই বই লিখার পরিকল্পনা মাথায় নিয়ে তিনি ঘুরছেন সেই ১৯৭১ সাল থেকে। অর্থাৎ কেনেডি মারা যাওয়ার মাত্র কয়েক বছর পর থেকেই। তখন তার প্রথম বই ক্যারি প্রকাশিত হয়েছে এবং তাকে এনে দিয়েছে বিপুল জনপ্রিয়তা। কিন্তু স্টিফেন কিং এর মনে হল- এমন একটা বই লিখার জন্য যে পরিমান লিটারেরি ট্যালেন্ট দরকার সেটা তার মধ্যে এখনও জন্মায়নি। তাই তিনি সে সময় অবিটি লিখেন নি। ফলে গল্পটা মাথায় নিয়ে ঘুরেছেন এই পুরো ৪০টি বছর! আপনি যদি বই পড়ে থ্রিল পেতে ভালবাসেন, তাহলে এই বইটি আপনার জন্য অবশ্য পাঠ্য।

আজকের মত এখানেই থামছি। সামনে আরও দারুণ সব বইয়ের রিভিউ নিয়ে হাজির হয়ে যাব আপনাদের সামনে। সে পর্যন্ত ভাল থাকুন। চাইলে বইটি নিয়ে বানানো মিনি টিভি সিরিজটিও দেখতে পারেন।

—————–

সাম্প্রতিক সময়ে সাড়া জাগানো বাংলা হিস্টোরিকাল থ্রিলার উপন্যাস ব্লাডস্টোন এর রিভিউ পড়ুন।

copyright-notice

মন্তব্য লিখুন