অভিশপ্ত ব্লাডি মেরি – যার নাম ১৩ বার বললে বেরিয়ে আসে অশরীরী আত্মা

62

ইউরোপ আমেরিকার দেশ গুলোতে টিন এজ মেয়েরা একসাথে ফুর্তি করার জন্য এক ধরণের পার্টির আয়োজন করে থাকে। এর নাম ‘স্লাম্বার পার্টি’। এই পার্টিতে বাবা-মার কাছ থেকে অনুমতি নিয়ে একরাতের জন্য সব মেয়ে বন্ধুরা এসে সমবেত হয় কোন এক বান্ধবীর ফাঁকা বাড়িতে। আর সেখানেই তারা রাত কাটায় আড্ডা মেরে। তাঁদের কাছে ‘স্লাম্বার পার্টি’ মানেই মেয়েদের বড় হয়ে ওঠার একটি ধাপ। আপাতদৃষ্টিতে ব্যাপারটা যতই নিরীহ বলে মনে হোক না কেন, সব “স্লাম্বার পার্টি” কিন্তু তেমনটা নয়! এই সময় টিন এজ মেয়েরা বয়ঃসন্ধির কৌতূহলে এমন কিছু কাণ্ড ঘটায়, যা প্রবল বিপদ ডেকে আনে। অনেক সময়ে মেয়েরা এই রাত-কাটানোর খেলায় না জেনে না বুঝে প্র্যাকটিস করতে শুরু করে কিছু নিষিদ্ধ খেলা। এই সমস্ত নিষিদ্ধ খেলার মধ্যে একটি হলো- ‘সামনিং অফ ব্লাডি মেরি ’।

কিন্তু কে এই ব্লাডি মেরি যার খেলাকে নিষিদ্ধ করা হয়েছে?

অভিশপ্ত ব্লাডি মেরি এর এই খেলা পশ্চিমা বিশ্বের এক অতি পুরনো ব্ল্যাক ম্যাজিক গেম। এই গেমে ব্লাডি মেরি নামে এক অভিশপ্ত নারীকে ডেকে আনা হয়। ডাকার নিয়মটাও গা শিউরে ওঠার মতো ভয়ংকর। প্রথমে অন্ধকার বাথরুমে একটা মোমবাতি জ্বালিয়ে আয়নার সামনে দাঁড়াতে হয়। তারপর ১৩ বার মন-প্রাণ দিয়ে উচ্চারণ করতে হয় ‘ব্লাডি মেরি… ব্লাডি মেরি… ব্লাডি মেরি…’। উচ্চারণ করতে হয় ফিস ফিস করে। তার পরে নাকি আয়নায় ফুটে ওঠে এক বিকৃত নারী-অবয়ব।

এই পর্যন্ত গল্পটা সকলেরই জানা। কিন্তু এরপর কী হয় তা জানেন কি?

প্যারানর্ম্যাল-বিদরা অনেকেই ব্লাডি মেরি-র পজেশনের কথা লিখেছেন। এমনকি- বাংলাদেশের জনপ্রিয় কথা-সাহিত্যিক মুহম্মদ জাফর ইকবালও তাঁর একটি গল্পে ব্লাডি মেরি পজেশনের ভয়াবহ বর্ণনা দিয়েছেন। সেখানে আয়না-নগরীর বসিন্দা ব্লাডি মেরি তার আহ্বায়িকাকে গ্রাস করে এবং সেই বাড়িতে ঘটতে থাকে ভয়ঙ্কর সব ঘটনা।

ব্লাডি মেরি পজেশন-কে কেন্দ্র করে এ পর্যন্ত হলিউডে নির্মিত হয়েছে বেশ কিছু সিনেমা। ১৯৮৮ সালে মুক্তি পায় ‘বিটলজুস’ নামে একটি মুভি যা তখনকার টিনএজ ছেলেমেয়েদের মধ্যে ব্যপক সাড়া ফেলতে সমর্থ হয়। ২০০৫ সালে নির্মিত হয় Urban Legends: Bloody Mary এবং ২০০৬ সালে মুক্তি পায় ‘Bloody Mary’ নামে একটি মুভি। এরপরও ব্লাডি মেরির কনসেপ্ট নিয়ে অনেক মুভি নির্মিত হয়েছে। এখন নিশ্চয়ই প্রস্ন জাগছে- কে এই ব্লাডি মেরি?

ব্লাডি মেরি এর কে ছিল?

কিংবদন্তি অনুযায়ী, ব্লাডি মেরি আসলে ইংল্যান্ডের রানী মেরি টিউডর, রাজা অষ্টম হেনরির কন্য। ১৫৫৩ সালে তিনি ইংল্যান্ডের সিংহাসনে বসেন। রানী হওয়ার পর তিনি এই অঞ্চলে রোমান ক্যাথলিজম প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেন। তখনকার ধর্মযাজকেরা এই সিদ্ধান্ত মেনে নেয়নি, তারা প্রতিবাদে রাস্তায় নামে। রানী মেরি প্রতিবাদকারীদের আগুনে পুড়িয়ে মেরে ফেলার নির্দেশ দেন। ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় তিনি অন্তত ২৮০ জন ধর্মযাজককে এভাবে মেরে ফেলেন। এমন নিষ্ঠুর মানসিকতার কারনে সাধারণ মানুষ তাকে “ব্লাডি মেরি” নামে ডাকতে শুরু করে। খুব বেশিদিন শাসন করতে পারেন নি তিনি। ১৫৫৮ সালে সন্তান জন্ম দিতে গিয়ে রানী মারা যান। অনেকেই মনে করেন ধার্মিক লোকদের মৃত আত্মার অভিশাপে তার এই করুণ পরিণতি হয়েছে। আর প্যারানর্মান বিশেষজ্ঞরা মনে করেন- মৃত্যুর পরও এই অভিশাপ থেকে মেরির মুক্তি মেলেনি। আয়নার ভেতরের এক রহস্য নগরীতে বন্দী হয়ে আছে তার পাপী আত্মা! যাকে ডেকে আনা যায়!

এই সম্পর্কে আরও ইতিহাস জানতে পারবেন হিস্টোরি সাইট থেকে। অথবা এই সম্পর্কে আমাদের বানানো ভিডিও প্রতিবেদনটিও দেখতে পারেন।

আসলেই কি ব্লাডি মেরিকে ডেকে আনা যায়?

ইউরোপ-আমেরিকার অনেক মহিলাই দাবি করেন, কম বয়সে তাঁরা ব্লাডিমেরি রিচুয়াল প্র্যাকটিস করেছেন। মোমের আলোয় বাথরুমের আয়নায় তাঁরা স্বচক্ষে দেখেছেন ফ্যাকাশে, বিকৃত নারী-অবয়ব ফুটে উঠতে।

কিন্তু মনোবিজ্ঞানিরা ব্লাডমেরির সত্যতা মেনে নেন না। তারা এই ঘটনার অন্যরকম ব্যাখ্যা দিয়েছেন। ইতালির বিখ্যাত মনোবিদ জিওভানি ক্যাপুতো ৫০জন মেয়ের উপরে একটি পরীক্ষা চালান। তিনি মেয়েদেরকে একা অবস্থায় আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে ১৩ বার ব্লাডমেরিকে ডাকতে বলেন এবং ১০ মিনিট একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকতে বলেন। মেয়েদের অনেকেই বলে যে তারা আয়নায় ব্লাডি মেরিকে দেখতে পেয়েছে। কিন্তু কাপুতোর ধারনা- চোখের নিউরন-ঘটিত সাময়িক সমস্যাই এই ‘বিকৃতি’-র জন্ম দিয়েছে। কাপুতো তার গবেষণা পত্রে লেখেন যে- “টিনএজ মেয়েরা স্বভাবতই কল্পনাপ্রবণ হয়। একাকী থাকা অবস্থায় তাদের মধ্যে সাইকোলজিক্যাল ইমব্যালেন্স ঘটেছে। ফলে তারা আয়নাতে নিজেদের মুখকে বিকৃত অবস্থায় দেখেছে, নয়তো কোনও অপরিচিত বিকৃত মুখচ্ছবি আয়নায় ফুটে উঠতে দেখেছে”।

এদিকে প্যারানর্মালবাদীরা কিন্তু এই ব্যাখ্যা মেনে নেন নি। তাঁরা আজও বলে বেড়ান- আয়নার ভিতরে কোনও রহস্য নগরী রয়েছে, যেখানে ব্লাডি মেরির অতৃপ্ত আত্মা বাস করে। সে প্রায়ই বেরিয়ে আসতে চায় তার বন্দিত্ব থেকে। তাকে জাগাতে কেবল প্রয়োজন- আবছায়া আলো, বাথরুমের ঝাপসা আয়না আর একাগ্র চিত্তে ১৩ বার ডাকতে হয়— ‘ব্লাডি মেরি… ব্লাডি মেরি… ব্লাডি মেরি…’

ওরে বাবা! আমার সাহস নেই ব্লাডি মেরিকে ডেকে আনার! আপনাদের কারো সাহস থাকলে চেষ্টা করে দেখতে পারেন। ব্লাডি মেরির দেখা যদি পান তাহলে ভিডিওতে কমেন্ট করে অবশ্যই আমাদের জানাবেন!

ভালো থাকুন সবাই। পরবর্তি আর্টিকেল গুলো পরার জন্য সবার আমন্ত্রন রইলো।

আরও পড়ুন:

কোন ৫টি লক্ষন দেখে বুঝবেন যে আপনার বাড়িতে ভুত আছে?

ডাইনিদের কূপ – প্রকৃতির এক আশ্চর্য রহস্য

অভিশপ্ত বাল্ট্রা দ্বীপ এর অমীমাংসিত রহস্য

মন্তব্য লিখুন
SHARE
ইশতিয়াক রেহমান থ্রিলার মাস্টার ওয়েব পোর্টাল এর স্বপ্নদ্রষ্টাদের মধ্যে একজন। তিনি পড়াশোনা করছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইন্টারন্যাশনাল বিজনেস বিভাগে। একাডেমিক স্টাডির পাশাপাশি তিনি ভালবাসেন নন ফিকশন লেখালেখি করতে। এছাড়াও তিনি ওয়েব ডিজাইন, গ্রাফিক্স ডিজাইন, ভিডিও মেকিং ইত্যাদি কাজেও দক্ষ।